সময় ম্যানেজ করার সমস্যাটা আসলে সময়ের না। দিনে ২৪ ঘণ্টা সবারই আছে। সমস্যাটা মনোযোগের। এক ঘণ্টা বসে থেকে যদি চল্লিশ মিনিট ফোনে চলে যায়, তাহলে সেটা এক ঘণ্টা কাজ না, বিশ মিনিট কাজ।
নিচের কৌশলগুলো কোনো তাত্ত্বিক লিস্ট না। এগুলো এমন জিনিস যেগুলো বাস্তবে মানুষ ব্যবহার করে, আর যেগুলোর জন্য আপনার নতুন কোনো অ্যাপ বা কোর্স লাগবে না।
১. দিন শুরু করুন তিনটা কাজ দিয়ে, দশটা না
লম্বা to-do লিস্ট দেখতে ভালো লাগে, কাজে লাগে না। বারোটা কাজের লিস্ট বানালে দিন শেষে সাতটা বাকি থাকে, আর মনে হয় কিছুই হয়নি।
সকালে বসে ঠিক করুন, আজ কোন তিনটা কাজ শেষ হলে দিনটা সফল। তিনটাই। বাকিগুলো হলে বোনাস।
লিখে রাখুন এমন জায়গায় যেটা চোখের সামনে থাকে। ফোনের নোটে লিখলে সেটা দেখতে ফোন খুলতে হবে, আর তখনই গল্পটা অন্যদিকে চলে যায়। একটা ডেস্ক টু-ডু লিস্ট প্যাড বা Focus Pad এই কারণেই কাজে দেয়, কাগজটা টেবিলে পড়ে থাকে, নোটিফিকেশন দেখায় না।
২. ঘড়ি দেখে কাজ করবেন না, সময় মেপে কাজ করুন
“আজ বিকেলে পড়ব” আর “এখন ২৫ মিনিট পড়ব” দুইটা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। প্রথমটা একটা ইচ্ছা, দ্বিতীয়টা একটা সিদ্ধান্ত।
এটাই পোমোডোরো টেকনিকের মূল কথা। ২৫ মিনিট একটানা কাজ, তারপর ৫ মিনিট বিরতি। চার রাউন্ড শেষে ১৫-২০ মিনিটের লম্বা বিরতি। ছোট, শেষ হওয়ার মতো একটা সময়সীমা থাকলে শুরু করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
শুরু করতে কিছু কিনতে হবে না। ফ্রি অনলাইন পোমোডোরো টাইমার দিয়ে আজই এক সপ্তাহ চালিয়ে দেখুন। যদি দেখেন কাজে দিচ্ছে, তখন আলাদা একটা টাইমারের কথা ভাবতে পারেন। ব্রাউজার ট্যাবে টাইমার চললে সেটা আপনার কাজের স্ক্রিনেই থাকে, আর ওই স্ক্রিনেই Facebook-ও থাকে।
৩. ফোনটা হাতের নাগালের বাইরে রাখুন
সাইলেন্ট করা যথেষ্ট না। উল্টো করে রাখাও না। ফোনটা যদি হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়, মাথার একটা অংশ সারাক্ষণ ওটার কথা ভাবতে থাকে।
সেশন শুরু করার আগে ফোনটা অন্য ঘরে রেখে আসুন, বা অন্তত পেছনের টেবিলে। উঠে গিয়ে আনতে হবে, এই সামান্য বাধাটুকুই বেশিরভাগ সময় যথেষ্ট।
এই জায়গাতেই ফোনের টাইমার সমস্যা তৈরি করে। টাইমার দিতে ফোন লাগবে, মানে ফোন কাছে রাখতে হবে। আলাদা টাইমারের পুরো সুবিধাটা এখানেই।
৪. একই ধরনের কাজ একসাথে সারুন
দিনে বারো বার ইমেইল চেক করা মানে বারো বার মনোযোগ ভাঙা। প্রতিবার আবার কাজে ফিরতে কয়েক মিনিট লাগে, আর সেই মিনিটগুলো যোগ হয়ে ঘণ্টা হয়ে যায়।
ইমেইল, ফোন কল, মেসেজের উত্তর, এগুলোর জন্য দিনে দুইটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। মাঝের সময়টা বন্ধ। প্রথম কয়েকদিন অস্বস্তি লাগবে, তারপর অভ্যাস হয়ে যাবে।
৫. সবচেয়ে কঠিন কাজটা সকালে
যে কাজটা করতে সবচেয়ে ইচ্ছা করছে না, সেটাই সকালে করুন। দিনের শুরুতে মনোযোগের ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে, আর কঠিন কাজটা শেষ হয়ে গেলে বাকি দিনটা হালকা লাগে।
উল্টোটা করলে কী হয় সবাই জানে। কাজটা সারাদিন মাথার পেছনে ঘুরতে থাকে, আর রাত দশটায় গিয়ে ক্লান্ত অবস্থায় শুরু করতে হয়।
৬. “না” বলতে শিখুন
টাইম ম্যানেজমেন্টের সবচেয়ে কম আলোচিত অংশ এটা। ক্যালেন্ডার ভরা থাকলে কোনো কৌশলই কাজ করে না।
প্রতিটা “হ্যাঁ” আসলে অন্য কিছুর জন্য “না”। মিটিংয়ে রাজি হওয়ার আগে একবার ভাবুন, এই এক ঘণ্টা অন্য কোথাও দিলে বেশি কাজে লাগত কিনা।
৭. বিরতিটা যেন সত্যিই বিরতি হয়
৫ মিনিটের বিরতিতে স্ক্রল করলে সেটা বিরতি না, স্ক্রিন থেকে স্ক্রিনে যাওয়া। মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায় না।
উঠে দাঁড়ান। পানি খান। জানালার বাইরে তাকান। একটু হাঁটুন। শুনতে সাধারণ লাগে, কিন্তু পরের ২৫ মিনিটের মান এই ৫ মিনিটের উপর অনেকটাই নির্ভর করে।
এখানেও টাইমারের সাইলেন্ট মোডটা কাজে লাগে, বিরতি শেষ হলে বুঝতে পারবেন কিন্তু আশেপাশের কাউকে বিরক্ত করবেন না।
৮. দিনের শেষে পাঁচ মিনিট
কাজ শেষে পাঁচ মিনিট বসুন। কী হলো, কী হলো না, কেন হলো না। তারপর কালকের তিনটা কাজ লিখে ফেলুন।
এর দুইটা লাভ। এক, কাল সকালে “কী করব” ভাবতে সময় নষ্ট হবে না। দুই, কোন সময়টায় আপনার কাজ ভালো হয় সেটা কয়েক সপ্তাহে নিজেই বুঝে যাবেন।
৯. পরিবেশটা আগে ঠিক করুন
ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বেশিদূর যাওয়া যায় না। পরিবেশ দিয়ে যায়।
টেবিলে যদি শুধু যে কাজটা করছেন তার জিনিসপত্র থাকে, মনোযোগ ধরে রাখা এমনিতেই সহজ হয়ে যায়। অগোছালো টেবিল, খোলা ট্যাব, পাশে ফোন, এই তিনটা মিলে যত সময় নষ্ট করে, কোনো প্রোডাক্টিভিটি টিপস তা পুষিয়ে দিতে পারে না।
কোনটা দিয়ে শুরু করবেন
একসাথে নয়টা চেষ্টা করতে যাবেন না, তিন দিনেই বাদ পড়ে যাবে। এই ক্রমে যান:
- এই সপ্তাহে: প্রতিদিন সকালে তিনটা কাজ লিখুন। আর কিছু না।
- পরের সপ্তাহে: এর সাথে যোগ করুন ২৫ মিনিটের সেশন। দিনে দুইটা দিয়ে শুরু করুন।
- তারপর: সেশনের সময় ফোন অন্য ঘরে।
তিন সপ্তাহ পর দেখবেন বাকিগুলো এমনিতেই জায়গামতো বসে যাচ্ছে।
কিছু সাধারণ প্রশ্ন
২৫ মিনিট আমার জন্য কম মনে হয়, কী করব?
বাড়িয়ে নিন। ২৫ মিনিট শুরু করার জন্য ভালো, কিন্তু নিয়মটা পাথরে লেখা না। অনেকে ৪৫ বা ৫০ মিনিটে ভালো করেন। আমাদের টাইমারগুলোতে ৫, ১০, ২৫ আর ৪৫ মিনিটের প্রিসেট আছে, আর পেছনের বাটন দিয়ে ১০০ মিনিট পর্যন্ত কাস্টম সময় সেট করা যায়।
ফোনের টাইমার দিয়ে হবে না?
হবে, যদি আপনি ফোন হাতে নিয়ে শুধু টাইমারটা সেট করে নামিয়ে রাখতে পারেন। বেশিরভাগ মানুষ পারে না। সমস্যাটা টাইমারে না, ডিভাইসে।
টাইম ম্যানেজমেন্ট শিখতে কত সময় লাগে?
শেখার কিছু নেই, অভ্যাস করার আছে। একটা অভ্যাস দাঁড়াতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগে। এজন্যই একটা করে ধরা উচিত।
লাইব্রেরিতে বা অফিসে টাইমার ব্যবহার করলে শব্দে সমস্যা হবে?
সাউন্ড বন্ধ রাখা যায়। তখন সময় শেষ হলে শুধু ডিসপ্লেতে দেখা যায়, আর কেউ টের পায় না।
শেষ কথা
টাইম ম্যানেজমেন্ট মানে দিনে আরও বেশি কাজ ঠুসে দেওয়া না। মানে হলো, যে কাজগুলো আসলেই জরুরি সেগুলোর জন্য জায়গা বের করা, আর বাকিটা নিয়ে অপরাধবোধ না রাখা।
শুরু করুন আজকের তিনটা কাজ লিখে। কাল ২৫ মিনিটের একটা সেশন যোগ করুন। এটুকুই যথেষ্ট।
আরও পড়ুন: পোমোডোরো টেকনিক কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে · Office & Stationery · ফ্রি অনলাইন পোমোডোরো টাইমার
